সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট/মূসক) কী এবং কীভাবে কাজ করে

বাংলাদেশে ব্যবসা করেন বা চাকরির পাশাপাশি আয়কর-ভ্যাট নিয়ে খোঁজখবর রাখেন, এমন প্রায় প্রত্যেকেই একসময় না একসময় "মূসক" বা "ভ্যাট" শব্দটির মুখোমুখি হন। কিন্তু অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না, ভ্যাট আসলে কীভাবে কাজ করে, কাদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক, আর কোন হারে কত ভ্যাট দিতে হয়। এই লেখায় সহজ ভাষায় মূল্য সংযোজন কর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আসলে কী

মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট হলো একধরনের পরোক্ষ কর, যা কোনো পণ্য বা সেবার উৎপাদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সংযোজিত মূল্যের উপর আরোপ করা হয়। সহজ কথায়, একটি পণ্য যতবার হাতবদল হয় এবং তার মূল্য যতটা বাড়ে, ততটুকু অংশের উপর সরকার একটি নির্দিষ্ট হারে কর নেয়। বাংলাদেশে এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) এই কর আদায়ের দায়িত্বে থাকে এবং "মূসক" শব্দটি ভ্যাটের বাংলা সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহৃত হয়।

ভ্যাট মূলত ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় হয়, তবে এটি সংগ্রহ ও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার দায়িত্ব থাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপর। অর্থাৎ একজন ব্যবসায়ী পণ্য বিক্রির সময় ভ্যাট আদায় করেন এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা সরকারের কাছে জমা দেন।

বর্তমান ভ্যাটের হার কত

মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ অনুযায়ী বেশিরভাগ পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য স্ট্যান্ডার্ড ভ্যাট রেট ১৫%। তবে নির্দিষ্ট কিছু খাতে কম হারেও ভ্যাট প্রযোজ্য হতে পারে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর হওয়া সংশোধনীর মাধ্যমে কিছু পণ্য ও সেবার ক্ষেত্রে আগে যেখানে ৫% বা ৭.৫% হারে ভ্যাট নেওয়া হতো, সেখানে এখন ১৫% হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে রেস্তোরাঁ, নন-এসি হোটেল, স্থানীয় ব্র্যান্ডের পোশাক, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ফার্ম এবং আরও কিছু খাত।

কোনো নির্দিষ্ট খাত বা পণ্যের ক্ষেত্রে সরকারি তালিকায় নাম না পেলে সাধারণত স্ট্যান্ডার্ড হার অর্থাৎ ১৫% প্রযোজ্য হয়। উৎসে ভ্যাট কর্তনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট তালিকা না পাওয়া গেলে ১৫% হারে অর্থাৎ বিধি রেট প্রযোজ্য হয়। যেহেতু প্রতি অর্থবছরের বাজেটে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে, তাই হালনাগাদ হার জানার জন্য সবসময় এনবিআরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট দেখে নেওয়া ভালো।

কাদের ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক

একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক টার্নওভারের ঊর্ধ্বে ব্যবসা পরিচালনা করলে ভ্যাট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হয়ে যায়। সাধারণত যেসব প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা সরবরাহ করে, যেমন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ী, আমদানি-রপ্তানিকারক, এবং বিভিন্ন ধরনের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান তাদের ভ্যাট নিবন্ধন নম্বর (BIN) থাকা জরুরি। এছাড়া সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, বীমা কোম্পানি, লিমিটেড কোম্পানি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকেও পণ্য বা সেবা ক্রয়ের ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট কর্তন করতে হয়।

ভ্যাট নিবন্ধনের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অনলাইন পোর্টালে আবেদন করতে হয়, যেখানে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় তথ্য, ট্রেড লাইসেন্স, টিআইএন এবং ব্যাংক হিসাবের বিবরণ জমা দিতে হয়।

উৎসে ভ্যাট কর্তন (VDS) কী

পণ্য বা সেবা ক্রয়ের সময় ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সরবরাহকারীকে পরিশোধিত অর্থ থেকে নির্দিষ্ট একটি অংশ ভ্যাট হিসেবে কেটে রাখে, একে বলা হয় উৎসে মূসক কর্তন বা VDS। নিবন্ধিত বা অনিবন্ধিত উভয় ধরনের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও এনজিওর ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে এই কর্তন বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়ায়।

তবে কিছু ক্ষেত্রে উৎসে ভ্যাট কর্তনের প্রয়োজন হয় না। যেমন, জ্বালানি তেল, গ্যাস, পানি, বিদ্যুৎ ও টেলিফোন-মোবাইল ফোন বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে উৎসে মূসক কর্তন করতে হয় না। এছাড়া ইলেকট্রনিক ফিসক্যাল ডিভাইস বা পিওএস থেকে ইস্যুকৃত চালানে ক্রেতার নাম ও নিবন্ধন নম্বর উল্লেখ থাকলেও কর্তনের প্রয়োজন পড়ে না।

ভ্যাট রিটার্ন কীভাবে জমা দেবেন

ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতি মাসের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আগের মাসের লেনদেনের ভ্যাট রিটার্ন জমা দিতে হয়। এই রিটার্ন এখন সম্পূর্ণ অনলাইনে জমা দেওয়া যায় এনবিআরের ভ্যাট অনলাইন পোর্টালের মাধ্যমে, এবং প্রযোজ্য ভ্যাটের অর্থও একই পোর্টাল থেকে পরিশোধ করা যায়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রিটার্ন জমা না দিলে বিলম্ব মাশুল গুনতে হয়।

প্রতিটি লেনদেনের জন্য একটি বৈধ ভ্যাট চালান ইস্যু করা আবশ্যক, যেখানে সরবরাহকারী ও গ্রাহকের নাম-ঠিকানা, পণ্য বা সেবার বিবরণ, একক মূল্য, মোট মূল্য, ভ্যাটের হার ও পরিমাণ, এবং চালান নম্বর ও তারিখ স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হয়। ভ্যাট সংক্রান্ত সব রেকর্ড অন্তত ৫ বছর সংরক্ষণ করার নিয়ম রয়েছে।

ভ্যাট না দিলে বা ভুল রিটার্ন দিলে কী হয়

নির্ধারিত সময়ে ভ্যাট রিটার্ন জমা না দিলে বা ভ্যাটের অর্থ যথাসময়ে পরিশোধ না করলে জরিমানা ও বিলম্ব সুদ আরোপ হয়। এছাড়া ইচ্ছাকৃতভাবে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে এনবিআর আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে, যার মধ্যে অর্থদণ্ড থেকে শুরু করে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করার মতো কঠোর পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তাই ব্যবসায়ীদের জন্য নিয়মিত ও সঠিকভাবে ভ্যাট হিসাব রাখা এবং সময়মতো রিটার্ন জমা দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শেষ কথা

ভ্যাট বা মূসক শুধু একটি সরকারি বাধ্যবাধকতা নয়, বরং দেশের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। একজন ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হিসেবে ভ্যাটের নিয়মকানুন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকলে আইনি জটিলতা এড়ানো যেমন সহজ হয়, তেমনি ব্যবসার আর্থিক পরিকল্পনাও আরও সুসংগঠিত হয়। যেহেতু প্রতি অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাটের হার ও বিধিমালায় পরিবর্তন আসতে পারে, তাই হালনাগাদ তথ্যের জন্য নিয়মিত এনবিআরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট (vat.gov.bd) দেখে নেওয়া উচিত, অথবা একজন অভিজ্ঞ কর পরামর্শকের সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।

দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের উদ্দেশ্যে তৈরি, এটি কোনো আইনি বা পেশাদার কর পরামর্শ নয়। নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের আগে এনবিআর বা যোগ্য কর পরামর্শকের সাথে পরামর্শ করুন।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ব্যক্তিবাচক হিসাব ও অব্যক্তিবাচক হিসাব কী? হিসাবের শ্রেণিবিভাগ সম্পূর্ণ আলোচনা

হিসাববিজ্ঞান পড়াশোনার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হিসাবের সঠিক শ্রেণিবিভাগ বোঝা। কোনো লেনদেন হিসাবের খাতায় তোলার আগে জানতে হয়—এটি কোন ধরনের হিসাব এবং সেই হিসাবে ডেবিট বা ক্রেডিট করার নিয়ম কী। সনাতন পদ্ধতিতে (Traditional Approach) হিসাবকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—ব্যক্তিবাচক হিসাব এবং অব্যক্তিবাচক হিসাব। এই লেখায় এই দুটি হিসাবের ধারণা, উদাহরণ, ডেবিট-ক্রেডিট নিয়ম এবং ব্যালেন্স বা জের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। হিসাবের শ্রেণিবিভাগ কেন জানা দরকার হিসাবের শ্রেণিবিভাগ না জানলে কোনো লেনদেন সঠিকভাবে জাবেদাভুক্ত করা সম্ভব হয় না। প্রতিটি হিসাবের নিজস্ব ডেবিট ও ক্রেডিটের নিয়ম রয়েছে এবং সেই নিয়ম জানা না থাকলে আর্থিক বিবরণী ভুল হয়ে যায়। এই কারণেই সনাতন পদ্ধতিতে হিসাবের শ্রেণিবিভাগ হিসাববিজ্ঞানের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে রপ্ত করতে হয়। সনাতন পদ্ধতিতে হিসাব মূলত দুই ধরনের — ব্যক্তিবাচক হিসাব এবং অব্যক্তিবাচক হিসাব । অব্যক্তিবাচক হিসাবকে আবার দুইভাগে ভাগ করা হয়, যথা: সম্পত্তিবাচক হিসাব এবং নামিক বা আয়-ব্যয়বাচক হিসাব। ব্যক্তিবাচক হিসাব কী ব্যক্তিবাচক হিসাব (Persona...

বকেয়া ভিত্তি কী? হিসাববিজ্ঞানে Accrual Basis of Accounting সম্পূর্ণ আলোচনা

আগের লেখায় আমরা নগদান ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তবে আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের মূল ভিত্তি আসলে অন্য একটি পদ্ধতির উপর দাঁড়িয়ে আছে—যাকে বলা হয় বকেয়া ভিত্তি বা Accrual Basis of Accounting। প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মাঝারি ও বড় আকারের কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণী তৈরিতে এই পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই লেখায় বকেয়া ভিত্তি কী, এর বৈশিষ্ট্য এবং নগদান ভিত্তির সাথে এর পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। বকেয়া ভিত্তি কাকে বলে বকেয়া ভিত্তিতে হিসাবরক্ষণ এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে আয় ও ব্যয় নগদ অর্থের আদান-প্রদানের উপর নির্ভর না করে, লেনদেন সংঘটিত হওয়ার সময়ের উপর ভিত্তি করে লিপিবদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ কোনো আয় অর্জিত (Earned) হলে, তা নগদে গৃহীত হোক বা না হোক, সাথে সাথেই তা আয় হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়। একইভাবে কোনো ব্যয় সংঘটিত (Incurred) হলে, তা নগদে পরিশোধিত হোক বা না হোক, লেনদেনটি সাথে সাথেই ব্যয় হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। সহজভাবে বললে, বকেয়া ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণীর পরিবর্তন ঘটায় এমন যেকোনো লেনদেন, তা সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই হিসাবের খাতায় তুলে রাখতে ...