সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ব্যক্তিবাচক হিসাব ও অব্যক্তিবাচক হিসাব কী? হিসাবের শ্রেণিবিভাগ সম্পূর্ণ আলোচনা

হিসাববিজ্ঞান পড়াশোনার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হিসাবের সঠিক শ্রেণিবিভাগ বোঝা। কোনো লেনদেন হিসাবের খাতায় তোলার আগে জানতে হয়—এটি কোন ধরনের হিসাব এবং সেই হিসাবে ডেবিট বা ক্রেডিট করার নিয়ম কী। সনাতন পদ্ধতিতে (Traditional Approach) হিসাবকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—ব্যক্তিবাচক হিসাব এবং অব্যক্তিবাচক হিসাব। এই লেখায় এই দুটি হিসাবের ধারণা, উদাহরণ, ডেবিট-ক্রেডিট নিয়ম এবং ব্যালেন্স বা জের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

হিসাবের শ্রেণিবিভাগ কেন জানা দরকার

হিসাবের শ্রেণিবিভাগ না জানলে কোনো লেনদেন সঠিকভাবে জাবেদাভুক্ত করা সম্ভব হয় না। প্রতিটি হিসাবের নিজস্ব ডেবিট ও ক্রেডিটের নিয়ম রয়েছে এবং সেই নিয়ম জানা না থাকলে আর্থিক বিবরণী ভুল হয়ে যায়। এই কারণেই সনাতন পদ্ধতিতে হিসাবের শ্রেণিবিভাগ হিসাববিজ্ঞানের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে রপ্ত করতে হয়।

সনাতন পদ্ধতিতে হিসাব মূলত দুই ধরনেরব্যক্তিবাচক হিসাব এবং অব্যক্তিবাচক হিসাব। অব্যক্তিবাচক হিসাবকে আবার দুইভাগে ভাগ করা হয়, যথা: সম্পত্তিবাচক হিসাব এবং নামিক বা আয়-ব্যয়বাচক হিসাব।

ব্যক্তিবাচক হিসাব কী

ব্যক্তিবাচক হিসাব (Personal Account) হলো সেই সমস্ত হিসাব, যা কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা তাদের প্রতিনিধিত্বকারী সত্তার নামে রাখা হয়। অর্থাৎ যখন কোনো লেনদেবে একজন মানুষ, একটি কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান সরাসরি সম্পর্কিত থাকে, তখন তার নামে যে হিসাব খোলা হয় সেটিই ব্যক্তিবাচক হিসাব।

ব্যক্তিবাচক হিসাব তিন ধরনের—

  • স্বাভাবিক ব্যক্তিবাচক হিসাব হলো বাস্তব মানুষের নামে রাখা হিসাব। যেমন উৎপল, জাহিদ, মীম ইত্যাদি ব্যক্তির নামে যে হিসাব খোলা হয়, তা স্বাভাবিক ব্যক্তিবাচক হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।
  • কৃত্রিম ব্যক্তিবাচক হিসাব হলো কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির নামে রাখা হিসাব। এই ধরনের হিসাবের নামের শেষে সাধারণত "লিমিটেড" শব্দটি থাকে। যেমন জাহিদ লিমিটেড, মীম লিমিটেড, বেক্সিমকো লিমিটেড ইত্যাদি।
  • প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যক্তিবাচক হিসাব হলো এমন হিসাব, যা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে পরোক্ষভাবে প্রতিনিধিত্ব করে। যেমন প্রাপ্য সুদ হিসাব, অগ্রিম বিমা হিসাব, মূলধন হিসাব ইত্যাদি এই শ্রেণির আওতায় পড়ে।

ব্যক্তিবাচক হিসাবে ডেবিট ও ক্রেডিটের নিয়ম

ব্যক্তিবাচক হিসাবে ডেবিট-ক্রেডিটের একটি সহজ নিয়ম রয়েছে—গ্রহীতাকে ডেবিট করো, দাতাকে ক্রেডিট করো। অর্থাৎ যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পণ্য বা সেবা গ্রহণ করছে, তার হিসাব ডেবিট হয়। আর যে দিচ্ছে, তার হিসাব ক্রেডিট হয়।
ব্যক্তিবাচক হিসাবের ব্যালেন্স বা জের সম্পর্কেও জানা জরুরি। ডেবিট জের হলে বোঝায় যে উক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যবসার কাছে দেনাদার, অর্থাৎ তারা টাকা পাওনা আছে। আর ক্রেডিট জের হলে বোঝায় যে উক্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান ব্যবসার পাওনাদার, অর্থাৎ ব্যবসাকে তাদের টাকা দিতে হবে।

অব্যক্তিবাচক হিসাব কী

অব্যক্তিবাচক হিসাব (Impersonal Account) হলো সেই সমস্ত হিসাব, যা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নামে নয়, বরং সম্পদ, আয় বা ব্যয়ের ধরন অনুযায়ী খোলা হয়। এই হিসাবকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়।

সম্পত্তিবাচক হিসাব (Real Account)

সম্পত্তিবাচক হিসাব হলো ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সম্পদ বা সম্পত্তি সংক্রান্ত হিসাব। যেমন নগদ হিসাব, আসবাবপত্র হিসাব, যন্ত্রপাতি হিসাব, ভূমি ও দালানকোঠা হিসাব ইত্যাদি সম্পত্তিবাচক হিসাবের উদাহরণ।
সম্পত্তিবাচক হিসাবে ডেবিট-ক্রেডিটের নিয়ম হলো—সম্পদ বৃদ্ধি পেলে ডেবিট হয়, আর সম্পদ হ্রাস পেলে ক্রেডিট হয়। এই হিসাবের ব্যালেন্স সবসময় ডেবিট জের হয়।

নামিক বা আয়-ব্যয়বাচক হিসাব (Nominal Account)

নামিক হিসাব বা আয়-ব্যয়বাচক হিসাব হলো প্রতিষ্ঠানের আয় ও ব্যয় সম্পর্কিত হিসাব। যেমন বেতন ব্যয় হিসাব, বিক্রয় হিসাব, ভাড়া ব্যয় হিসাব, সুদ আয় হিসাব ইত্যাদি।
নামিক হিসাবে ডেবিট-ক্রেডিটের নিয়ম হলো—ব্যয় হলে ডেবিট হয়, আর আয় হলে ক্রেডিট হয়। ব্যয়বাচক হিসাবের ডেবিট জের হয় এবং আয়বাচক হিসাবের ক্রেডিট জের হয়।

সহজে মনে রাখার উপায়

তিন ধরনের হিসাবে ডেবিট-ক্রেডিটের নিয়মগুলো নিচের ছকে একনজরে দেখে নিলে মনে রাখা সহজ হয়—

হিসাবের শ্রেণিবিভাগ — ডেবিট ও ক্রেডিটের নিয়ম

সনাতন পদ্ধতি (Traditional Approach) অনুযায়ী

হিসাবের ধরন ডেবিট হয় ক্রেডিট হয় ব্যালেন্স / জের
ব্যক্তিবাচক হিসাব
(Personal Account)
গ্রহীতা হলে দাতা হলে ডেবিট জের → ব্যবসার দেনাদার
ক্রেডিট জের → ব্যবসার পাওনাদার
সম্পত্তিবাচক হিসাব
(Real Account)
বৃদ্ধি পেলে হ্রাস পেলে সবসময় ডেবিট জের
নামিক / আয়-ব্যয়বাচক হিসাব
(Nominal Account)
ব্যয় হলে আয় হলে ব্যয়বাচকে → ডেবিট জের
আয়বাচকে → ক্রেডিট জের

ব্যালেন্স বা জের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ধারণা

শেষ কথা

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট/মূসক) কী এবং কীভাবে কাজ করে

বাংলাদেশে ব্যবসা করেন বা চাকরির পাশাপাশি আয়কর-ভ্যাট নিয়ে খোঁজখবর রাখেন, এমন প্রায় প্রত্যেকেই একসময় না একসময় "মূসক" বা "ভ্যাট" শব্দটির মুখোমুখি হন। কিন্তু অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না, ভ্যাট আসলে কীভাবে কাজ করে, কাদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক, আর কোন হারে কত ভ্যাট দিতে হয়। এই লেখায় সহজ ভাষায় মূল্য সংযোজন কর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আসলে কী মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট হলো একধরনের পরোক্ষ কর, যা কোনো পণ্য বা সেবার উৎপাদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সংযোজিত মূল্যের উপর আরোপ করা হয়। সহজ কথায়, একটি পণ্য যতবার হাতবদল হয় এবং তার মূল্য যতটা বাড়ে, ততটুকু অংশের উপর সরকার একটি নির্দিষ্ট হারে কর নেয়। বাংলাদেশে এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) এই কর আদায়ের দায়িত্বে থাকে এবং "মূসক" শব্দটি ভ্যাটের বাংলা সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহৃত হয়। ভ্যাট মূলত ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় হয়, তবে এটি সংগ্রহ ও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার দায়িত্ব থাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপর। অর্থাৎ একজন ব্যবসায়ী পণ্...

পরোক্ষ কর কী? হিসাব বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে সম্পূর্ণ ধারণা

হিসাব বিজ্ঞান পড়াশোনার শুরুতেই যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার সাথে পরিচিত হতে হয়, তার মধ্যে অন্যতম হলো কর ব্যবস্থা—বিশেষ করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর। ব্যবসায়িক হিসাবরক্ষণ, আর্থিক বিবরণী তৈরি কিংবা সরকারি রাজস্ব ব্যবস্থা বোঝার জন্য পরোক্ষ কর সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। এই লেখায় সহজ ভাষায় পরোক্ষ কর কী, এর বৈশিষ্ট্য, প্রকারভেদ এবং প্রত্যক্ষ করের সাথে পার্থক্য নিয়ে আলোচনা করা হলো। পরোক্ষ কর কী পরোক্ষ কর হলো এমন এক ধরনের কর, যা সরকার সরাসরি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের আয়ের উপর আরোপ না করে, পণ্য বা সেবার উৎপাদন, ক্রয়-বিক্রয় বা ব্যবহারের উপর আরোপ করে। এই কর প্রথমে ব্যবসায়ী বা বিক্রেতার কাছ থেকে আদায় করা হলেও, প্রকৃতপক্ষে এর ভার গিয়ে পড়ে চূড়ান্ত ভোক্তার উপর। অর্থাৎ একজন বিক্রেতা সরকারকে কর পরিশোধ করেন ঠিকই, কিন্তু তিনি সেই করের পরিমাণ পণ্যের মূল্যের সাথে যুক্ত করে ক্রেতার কাছ থেকেই আদায় করে নেন। সহজভাবে বললে, পরোক্ষ কর এমন একটি কর ব্যবস্থা, যেখানে কর পরিশোধকারী (ব্যবসায়ী) এবং কর বহনকারী (ভোক্তা) দুজন আলাদা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। হিসাব বিজ্ঞানে এই করকে সাধারণত দায় (liability) হ...

বকেয়া ভিত্তি কী? হিসাববিজ্ঞানে Accrual Basis of Accounting সম্পূর্ণ আলোচনা

আগের লেখায় আমরা নগদান ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তবে আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের মূল ভিত্তি আসলে অন্য একটি পদ্ধতির উপর দাঁড়িয়ে আছে—যাকে বলা হয় বকেয়া ভিত্তি বা Accrual Basis of Accounting। প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মাঝারি ও বড় আকারের কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণী তৈরিতে এই পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই লেখায় বকেয়া ভিত্তি কী, এর বৈশিষ্ট্য এবং নগদান ভিত্তির সাথে এর পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। বকেয়া ভিত্তি কাকে বলে বকেয়া ভিত্তিতে হিসাবরক্ষণ এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে আয় ও ব্যয় নগদ অর্থের আদান-প্রদানের উপর নির্ভর না করে, লেনদেন সংঘটিত হওয়ার সময়ের উপর ভিত্তি করে লিপিবদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ কোনো আয় অর্জিত (Earned) হলে, তা নগদে গৃহীত হোক বা না হোক, সাথে সাথেই তা আয় হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়। একইভাবে কোনো ব্যয় সংঘটিত (Incurred) হলে, তা নগদে পরিশোধিত হোক বা না হোক, লেনদেনটি সাথে সাথেই ব্যয় হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। সহজভাবে বললে, বকেয়া ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণীর পরিবর্তন ঘটায় এমন যেকোনো লেনদেন, তা সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই হিসাবের খাতায় তুলে রাখতে ...