সরাসরি প্রধান সামগ্রীতে চলে যান

ইস্যুকৃত চেক ব্যাংক কর্তৃক অমর্যাদা(Dishonoured) হলে ব্যাংক হিসাবে কী জাবেদা এন্ট্রি হবে? — সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা ও সমাধান

লেখক পরিচিতি

এই আর্টিকেলটি লিখেছেন মনিরুজ্জামান মুন্না, যিনি বর্তমানে লক্ষ্মীপুর সরকারি কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনা (Management) বিষয়ে অনার্স 2য় বর্ষে অধ্যয়নরত।

হিসাববিজ্ঞান (Accounting) বিষয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও পরীক্ষায় বারবার আসা একটি টপিক হলো ব্যাংক রিকনসিলিয়েশন স্টেটমেন্ট (Bank Reconciliation Statement)। এই টপিকের একটি ক্লাসিক প্রশ্ন হলো — "ইস্যুকৃত চেক ব্যাংক কর্তৃক অমর্যাদা (Dishonoured) হলে ব্যাংক হিসাবে কী এন্ট্রি হবে?" অনার্স, ডিগ্রি ও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় এই প্রশ্নটি বহুনির্বাচনী (MCQ) আকারে প্রায়ই আসে। আজকের আর্টিকেলে আমরা এই প্রশ্নের প্রতিটি অপশন বিশ্লেষণ করে সঠিক উত্তর ও তার যুক্তি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করব।

প্রশ্নটি কী ছিল

ইস্যুকৃত চেক ব্যাংক কর্তৃক অমর্যাদা হলে ব্যাংক হিসাবে কী এন্ট্রি হবে?

A. ব্যাংক হিসাব ডেবিট, পাওনাদার হিসাব ক্রেডিট

B. আদিষ্ট হিসাব ডেবিট, ব্যাংক হিসাব ক্রেডিট

C. ব্যাংক হিসাব ডেবিট, দেনাদার হিসাব ক্রেডিট

D. কোনো এন্ট্রি দেওয়ার প্রয়োজন নেই

সঠিক উত্তর: D — কোনো এন্ট্রির প্রয়োজন নেই, তবে গ্রাহকের (কাস্টমারের) বইতে এন্ট্রি দিতে হবে।

কেন উত্তরটি "D" — মূল যুক্তি

এই প্রশ্নের মূল বিষয়টি বোঝার জন্য আগে বুঝতে হবে "ব্যাংক হিসাব" বলতে কার বই বোঝানো হচ্ছে। এখানে "ব্যাংক হিসাব" মানে হলো ব্যাংকের নিজস্ব বই (Bank's own books), অর্থাৎ ব্যাংক তার গ্রাহকদের নিয়ে যে হিসাব রাখে — সেটা নয়। বরং এটি বোঝায় প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির খতিয়ানে থাকা ব্যাংক হিসাব।

যখন একটি প্রতিষ্ঠান কোনো পাওনাদার বা সরবরাহকারীকে চেক ইস্যু করে, তখন প্রতিষ্ঠানের বইতে সাথে সাথেই একটি জাবেদা এন্ট্রি দেওয়া হয়:

পাওনাদার হিসাব ডেবিট

ব্যাংক হিসাব ক্রেডিট

এখন যদি সেই চেকটি পরবর্তীতে ব্যাংক কর্তৃক অমর্যাদা (dishonour) করা হয় — অর্থাৎ যথেষ্ট তহবিলের অভাবে বা অন্য কোনো কারণে চেকটি পাস না হয় — তাহলে বাস্তবে ব্যাংক থেকে কোনো টাকাই কাটা হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে (Cash Book-এর Bank Column) নতুন করে কোনো এন্ট্রি দেওয়ার প্রয়োজন হয় না, কারণ মূল এন্ট্রিটিই বাতিল হয়ে গেছে বা তার প্রভাব শূন্য হয়ে গেছে।

তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো — গ্রাহক বা পাওনাদারের বইতে অবশ্যই এন্ট্রি দিতে হবে, কারণ তারা ধরে নিয়েছিল টাকা পেয়ে গেছে, কিন্তু বাস্তবে চেক ফেরত এসেছে। তাই পাওনাদারের বইতে বিপরীত এন্ট্রি (reversal entry) দিতে হয় — অর্থাৎ পূর্বের ডেবিট এন্ট্রি বাতিল করে আবার দেনাদার হিসাব ডেবিট এবং নগদ/ব্যাংক হিসাব ক্রেডিট করতে হয়।

শেষ কথা 

"ইস্যুকৃত চেক অসম্মানিত হলে জাবেদা এন্ট্রি" সংক্রান্ত এই প্রশ্নটি হিসাববিজ্ঞানের একটি ধারণাগত (conceptual) প্রশ্ন, যেখানে মুখস্থবিদ্যার চেয়ে লেনদেনের প্রকৃত প্রকৃতি বোঝাটাই বেশি জরুরি। কে চেক ইস্যু করেছে আর কে চেক পেয়েছে — এই দুটি পক্ষের বই আলাদা করে চিন্তা করলেই উত্তর সহজেই বের করা যায়।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

ব্যক্তিবাচক হিসাব ও অব্যক্তিবাচক হিসাব কী? হিসাবের শ্রেণিবিভাগ সম্পূর্ণ আলোচনা

হিসাববিজ্ঞান পড়াশোনার একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হিসাবের সঠিক শ্রেণিবিভাগ বোঝা। কোনো লেনদেন হিসাবের খাতায় তোলার আগে জানতে হয়—এটি কোন ধরনের হিসাব এবং সেই হিসাবে ডেবিট বা ক্রেডিট করার নিয়ম কী। সনাতন পদ্ধতিতে (Traditional Approach) হিসাবকে প্রধানত দুটি ভাগে ভাগ করা হয়—ব্যক্তিবাচক হিসাব এবং অব্যক্তিবাচক হিসাব। এই লেখায় এই দুটি হিসাবের ধারণা, উদাহরণ, ডেবিট-ক্রেডিট নিয়ম এবং ব্যালেন্স বা জের নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। হিসাবের শ্রেণিবিভাগ কেন জানা দরকার হিসাবের শ্রেণিবিভাগ না জানলে কোনো লেনদেন সঠিকভাবে জাবেদাভুক্ত করা সম্ভব হয় না। প্রতিটি হিসাবের নিজস্ব ডেবিট ও ক্রেডিটের নিয়ম রয়েছে এবং সেই নিয়ম জানা না থাকলে আর্থিক বিবরণী ভুল হয়ে যায়। এই কারণেই সনাতন পদ্ধতিতে হিসাবের শ্রেণিবিভাগ হিসাববিজ্ঞানের শুরুতেই শিক্ষার্থীদের ভালোভাবে রপ্ত করতে হয়। সনাতন পদ্ধতিতে হিসাব মূলত দুই ধরনের — ব্যক্তিবাচক হিসাব এবং অব্যক্তিবাচক হিসাব । অব্যক্তিবাচক হিসাবকে আবার দুইভাগে ভাগ করা হয়, যথা: সম্পত্তিবাচক হিসাব এবং নামিক বা আয়-ব্যয়বাচক হিসাব। ব্যক্তিবাচক হিসাব কী ব্যক্তিবাচক হিসাব (Persona...

মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট/মূসক) কী এবং কীভাবে কাজ করে

বাংলাদেশে ব্যবসা করেন বা চাকরির পাশাপাশি আয়কর-ভ্যাট নিয়ে খোঁজখবর রাখেন, এমন প্রায় প্রত্যেকেই একসময় না একসময় "মূসক" বা "ভ্যাট" শব্দটির মুখোমুখি হন। কিন্তু অনেকেই সঠিকভাবে জানেন না, ভ্যাট আসলে কীভাবে কাজ করে, কাদের জন্য এটি বাধ্যতামূলক, আর কোন হারে কত ভ্যাট দিতে হয়। এই লেখায় সহজ ভাষায় মূল্য সংযোজন কর সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আসলে কী মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট হলো একধরনের পরোক্ষ কর, যা কোনো পণ্য বা সেবার উৎপাদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সংযোজিত মূল্যের উপর আরোপ করা হয়। সহজ কথায়, একটি পণ্য যতবার হাতবদল হয় এবং তার মূল্য যতটা বাড়ে, ততটুকু অংশের উপর সরকার একটি নির্দিষ্ট হারে কর নেয়। বাংলাদেশে এনবিআর (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) এই কর আদায়ের দায়িত্বে থাকে এবং "মূসক" শব্দটি ভ্যাটের বাংলা সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে সরকারি কাগজপত্রে ব্যবহৃত হয়। ভ্যাট মূলত ভোক্তার কাছ থেকেই আদায় হয়, তবে এটি সংগ্রহ ও সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়ার দায়িত্ব থাকে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উপর। অর্থাৎ একজন ব্যবসায়ী পণ্...

বকেয়া ভিত্তি কী? হিসাববিজ্ঞানে Accrual Basis of Accounting সম্পূর্ণ আলোচনা

আগের লেখায় আমরা নগদান ভিত্তি নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তবে আধুনিক হিসাববিজ্ঞানের মূল ভিত্তি আসলে অন্য একটি পদ্ধতির উপর দাঁড়িয়ে আছে—যাকে বলা হয় বকেয়া ভিত্তি বা Accrual Basis of Accounting। প্রতিটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে মাঝারি ও বড় আকারের কোম্পানিগুলোর আর্থিক বিবরণী তৈরিতে এই পদ্ধতিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। এই লেখায় বকেয়া ভিত্তি কী, এর বৈশিষ্ট্য এবং নগদান ভিত্তির সাথে এর পার্থক্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো। বকেয়া ভিত্তি কাকে বলে বকেয়া ভিত্তিতে হিসাবরক্ষণ এমন একটি পদ্ধতি, যেখানে আয় ও ব্যয় নগদ অর্থের আদান-প্রদানের উপর নির্ভর না করে, লেনদেন সংঘটিত হওয়ার সময়ের উপর ভিত্তি করে লিপিবদ্ধ করা হয়। অর্থাৎ কোনো আয় অর্জিত (Earned) হলে, তা নগদে গৃহীত হোক বা না হোক, সাথে সাথেই তা আয় হিসেবে হিসাবভুক্ত করা হয়। একইভাবে কোনো ব্যয় সংঘটিত (Incurred) হলে, তা নগদে পরিশোধিত হোক বা না হোক, লেনদেনটি সাথে সাথেই ব্যয় হিসেবে লিপিবদ্ধ করা হয়। সহজভাবে বললে, বকেয়া ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক বিবরণীর পরিবর্তন ঘটায় এমন যেকোনো লেনদেন, তা সংঘটিত হওয়ার সাথে সাথেই হিসাবের খাতায় তুলে রাখতে ...