- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
দেশের বাজারে যখন দ্রব্যমূল্য প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকে, তখন একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি হলো — মজুত পণ্য কীভাবে মূল্যায়ন করা হবে। হিসাববিজ্ঞানের শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ব্যবসায় ব্যবস্থাপক, সবার কাছেই এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ: মুদ্রাস্ফীতির সময় মজুত পণ্য মূল্যায়নে কোন পদ্ধতি বেশি কার্যকর?
সংক্ষেপে উত্তর হলো — LIFO (Last In, First Out) পদ্ধতি। কিন্তু কেন এই পদ্ধতিই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত, আর FIFO বা গড় মূল্য পদ্ধতির চেয়ে এটি কীভাবে আলাদা কাজ করে — সেটাই আজ সহজভাবে বুঝব।
মজুত পণ্য মূল্যায়ন পদ্ধতি কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?
একটি ব্যবসা যখন একই পণ্য বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দামে ক্রয় করে, তখন বছরের শেষে অবিক্রীত পণ্যের (মজুত পণ্য) মূল্য কত ধরা হবে এবং বিক্রীত পণ্যের ব্যয় (Cost of Goods Sold) কত হিসাব করা হবে, তা নির্ধারণ করতে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। এই পদ্ধতির উপর নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের নিট মুনাফা, কর দায় এবং আর্থিক বিবরণী — সবকিছুই প্রভাবিত হয়।
সাধারণত প্রচলিত পদ্ধতিগুলো হলো:
- FIFO (First In, First Out) — প্রথমে ক্রয় করা পণ্য প্রথমে বিক্রি হয়েছে ধরে হিসাব করা হয়
- LIFO (Last In, First Out) — সর্বশেষ ক্রয় করা পণ্য প্রথমে বিক্রি হয়েছে ধরে হিসাব করা হয়
- ভারযুক্ত গড় মূল্য পদ্ধতি (Weighted Average Cost Method)
- সুনির্দিষ্ট চিহ্নিতকরণ পদ্ধতি (Specific Identification Method)
মুদ্রাস্ফীতির সময় LIFO কেন সবচেয়ে কার্যকর?
মুদ্রাস্ফীতির সময় পণ্যের ক্রয়মূল্য ক্রমাগত বাড়তে থাকে। এই পরিস্থিতিতে LIFO পদ্ধতিতে সবচেয়ে সাম্প্রতিক ও সবচেয়ে বেশি দামে কেনা পণ্যকে প্রথমে বিক্রীত পণ্য হিসেবে ধরা হয়। ফলে যা ঘটে তা হলো:
- বিক্রীত পণ্যের ব্যয় (COGS) বর্তমান বাজারমূল্যের কাছাকাছি এবং তুলনামূলক বেশি দেখানো হয়
- এর ফলে নিট মুনাফা কম দেখানো হয়, যা প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ
- মুনাফা কম দেখানোর কারণে করযোগ্য আয়ও কমে যায়, ফলে প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে কর সাশ্রয় করতে পারে
- আয় বিবরণীতে আয়-ব্যয়ের মিলকরণ (Matching Principle) আরও যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়, কারণ সাম্প্রতিক আয়ের সাথে সাম্প্রতিক ব্যয়ই মিলানো হচ্ছে
অন্যদিকে, FIFO পদ্ধতিতে পুরনো, কম দামে কেনা পণ্যকে আগে বিক্রীত ধরা হয় বলে বিক্রীত পণ্যের ব্যয় কম দেখায় এবং মুনাফা তুলনামূলক বেশি দেখায়। এই বাড়তি মুনাফা প্রকৃতপক্ষে মূল্যস্ফীতিজনিত একটি কাল্পনিক লাভ (inflationary profit), যা প্রতিষ্ঠানের জন্য বাড়তি কর দায় তৈরি করতে পারে।
একটি সহজ উদাহরণ
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান প্রথমে ১০ টাকা দরে কিছু পণ্য কিনেছে এবং পরে দাম বেড়ে যাওয়ায় একই পণ্য ১৫ টাকা দরে আবার কিনেছে। এখন যদি প্রতিষ্ঠানটি এক ইউনিট পণ্য বিক্রি করে, তাহলে:
- LIFO অনুযায়ী ধরা হবে সর্বশেষ কেনা ১৫ টাকার পণ্যটিই বিক্রি হয়েছে — অর্থাৎ বিক্রীত পণ্যের ব্যয় বেশি, মুনাফা কম
- FIFO অনুযায়ী ধরা হবে প্রথমে কেনা ১০ টাকার পণ্যটি বিক্রি হয়েছে — অর্থাৎ বিক্রীত পণ্যের ব্যয় কম, মুনাফা বেশি
- এই সাধারণ উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট হয়, কেন মূল্যস্ফীতির বাজারে LIFO পদ্ধতিকে অধিকতর বাস্তবসম্মত ও কার্যকর ধরা হয়।
LIFO পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা
LIFO পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে, যা জানা জরুরি:
- সমাপনী মজুত পণ্যের মূল্য পুরনো (কম) দামে দেখানো হয় বলে উদ্বৃত্তপত্রে মজুত পণ্যের মূল্য প্রকৃত বাজারমূল্যের তুলনায় কম প্রতিফলিত হয়
- আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিবেদন মান IFRS-এ LIFO পদ্ধতি অনুমোদিত নয়, যদিও যুক্তরাষ্ট্রের GAAP-এ এটি ব্যবহারের অনুমতি আছে
- হিসাব রাখার প্রক্রিয়া তুলনামূলক জটিল হতে পারে, বিশেষ করে ঘনঘন মূল্য পরিবর্তনের ক্ষেত্রে
উপসংহার
মুদ্রাস্ফীতির বাজারে যেহেতু পণ্যের দাম ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তাই LIFO (Last In, First Out) পদ্ধতিই মজুত পণ্য মূল্যায়নে সবচেয়ে কার্যকর ও বাস্তবসম্মত পদ্ধতি হিসেবে বিবেচিত হয়। এটি বিক্রীত পণ্যের ব্যয়কে বর্তমান বাজারমূল্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখে, প্রকৃত মুনাফা প্রতিফলিত করে এবং সাময়িক কর সাশ্রয়ে সহায়তা করে। তবে প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন মান মেনে চলার প্রয়োজনীয়তা এবং ব্যবসার প্রকৃতি বিবেচনা করেই এই পদ্ধতি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন