- লিঙ্ক পান
- X
- ইমেল
- অন্যান্য অ্যাপ
হিসাববিজ্ঞান পড়তে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীর মনে একটি প্রশ্ন প্রায়ই দেখা দেয় — স্থায়ী সম্পত্তি তো মূলধনজাতীয় সম্পদ, তাহলে সম্পত্তির অবচয়কে কেন মুনাফাজাতীয় ব্যয় (Revenue Expenditure) হিসেবে গণ্য করা হয়? এই বিভ্রান্তি খুবই স্বাভাবিক, কারণ ভাসাভাসাভাবে দেখলে মনে হতে পারে অবচয় বুঝি মূলধনজাতীয় লেনদেন। কিন্তু হিসাববিজ্ঞানের মূলনীতি অনুযায়ী বাস্তবতা ভিন্ন।
আজকের আর্টিকেলে সহজ ভাষায়, উদাহরণসহ বুঝব কেন অবচয়কে মুনাফাজাতীয় ব্যয় বলা হয় এবং এর পেছনের হিসাববিজ্ঞানের যুক্তি কী।
অবচয় (Depreciation) কী?
অবচয় হলো কোনো স্থায়ী সম্পত্তির (যেমন: যন্ত্রপাতি, আসবাবপত্র, দালানকোঠা, যানবাহন) ব্যবহার, সময়ের প্রবাহ, ক্ষয়প্রাপ্তি বা প্রযুক্তিগত সেকেলে হয়ে যাওয়ার কারণে তার মূল্যের ক্রমশ হ্রাস। একটি সম্পত্তি একবার কেনার পর তা বছরের পর বছর ব্যবহৃত হয়, আর প্রতি বছর তার কার্যক্ষমতা ও মূল্য কিছুটা করে কমতে থাকে। হিসাববিজ্ঞানে এই মূল্যহ্রাসকে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে (যেমন সরলরৈখিক পদ্ধতি বা ক্রমহ্রাসমান জের পদ্ধতি) হিসাবভুক্ত করা হয়।
মুনাফাজাতীয় ব্যয় বনাম মূলধনজাতীয় ব্যয়
অবচয় কেন মুনাফাজাতীয় ব্যয়, তা বুঝতে হলে আগে এই দুটি ধারণার পার্থক্য স্পষ্ট হওয়া দরকার।
- মূলধনজাতীয় ব্যয় (Capital Expenditure): এমন ব্যয় যা দীর্ঘমেয়াদে সুবিধা প্রদান করে এবং স্থায়ী সম্পত্তি অর্জন বা তার মূল্য/উৎপাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির সাথে সম্পর্কিত। যেমন — নতুন যন্ত্রপাতি ক্রয়, দালান নির্মাণ ইত্যাদি।
- মুনাফাজাতীয় ব্যয় (Revenue Expenditure): এমন ব্যয় যা স্বল্পমেয়াদী সুবিধা দেয় এবং চলতি হিসাবকালের আয় অর্জনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। যেমন — বেতন, ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, মেরামত খরচ ইত্যাদি।
সম্পত্তির অবচয় মুনাফাজাতীয় ব্যয় কেন?
১. এটি চলতি বছরের আয়ের সাথে সম্পর্কিত
একটি স্থায়ী সম্পত্তি একবার কেনা হলেও সেটি প্রতি বছর ব্যবসার আয় অর্জনে সহায়তা করে। যে বছর সম্পত্তিটি ব্যবহৃত হচ্ছে, সেই বছরের আয় অর্জনের বিনিময়ে সম্পত্তিটির মূল্য কিছুটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। তাই আয়-ব্যয়ের মিলকরণ নীতি (Matching Principle) অনুযায়ী, ঐ বছরের আয়ের সাথে অবচয় ব্যয়কেও মিলিয়ে দেখানো প্রয়োজন — ঠিক যেভাবে বেতন বা ভাড়ার মতো অন্যান্য চলতি ব্যয় মিলানো হয়।
২. অবচয় সম্পত্তির নতুন মূল্য বৃদ্ধি করে না
মূলধনজাতীয় ব্যয়ের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি সম্পত্তির মূল্য বা উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ায়। কিন্তু অবচয় ঠিক তার উল্টো কাজ করে — এটি সম্পত্তির মূল্য কমায়, বাড়ায় না। যেহেতু এটি নতুন কোনো সম্পদ সৃষ্টি করে না, বরং বিদ্যমান সম্পদের ব্যবহারজনিত ক্ষয় নির্দেশ করে, তাই এটি মূলধনজাতীয় লেনদেনের সংজ্ঞায় পড়ে না।
৩. প্রতি বছর আয় বিবরণীতে চার্জ করা হয়
অবচয়কে বছরের শেষে আয় বিবরণী বা লাভ-ক্ষতি হিসাবে (Income Statement) একটি ব্যয় হিসেবে দেখানো হয় এবং তা নিট মুনাফা নির্ণয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে। যেহেতু এটি প্রতি বছরের মুনাফা নির্ণয়ে সরাসরি জড়িত, তাই এটি একটি মুনাফাজাতীয় ব্যয়ই বটে।
৪. এটি সম্পত্তির ক্রয়মূল্যকে ব্যবহারকালের মধ্যে বণ্টন করে মাত্র
প্রকৃতপক্ষে অবচয় একটি সম্পত্তির মোট ক্রয়মূল্যকে তার আয়ুষ্কাল জুড়ে ধীরে ধীরে ব্যয় হিসেবে ভাগ করে দেয়। সম্পত্তি কেনার সময় যে ব্যয়টি মূলধনজাতীয় ছিল, সময়ের সাথে সাথে তারই একটি অংশ প্রতি বছর মুনাফাজাতীয় ব্যয় হিসেবে হিসাবভুক্ত হয়। এটাই অবচয়ের মূল কার্যপ্রণালী।
একটি সহজ উদাহরণ
ধরা যাক, একটি প্রতিষ্ঠান ৫,০০,০০০ টাকায় একটি যন্ত্রপাতি কিনল, যার আয়ুষ্কাল ১০ বছর। যন্ত্রপাতি কেনার সময়কার ৫,০০,০০০ টাকা একটি মূলধনজাতীয় ব্যয়। কিন্তু প্রতি বছর এই যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে যে আয় অর্জিত হচ্ছে, তার বিপরীতে বছরে ৫০,০০০ টাকা করে (সরলরৈখিক পদ্ধতিতে) যে অবচয় ধার্য করা হবে, সেটিই হলো মুনাফাজাতীয় ব্যয় — কারণ এটি ঐ নির্দিষ্ট বছরের আয়ের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত।
সম্পত্তি ক্রয় করা মূলধনজাতীয় ব্যয় হলেও, সেই সম্পত্তির ব্যবহারজনিত মূল্যহ্রাস অর্থাৎ অবচয়কে মুনাফাজাতীয় ব্যয় হিসেবে গণ্য করা হয়, কারণ এটি চলতি বছরের আয়ের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত, প্রতি বছর পুনরাবৃত্ত হয়, এবং আয় বিবরণীতে নিট মুনাফা নির্ণয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে। আয়-ব্যয়ের মিলকরণ নীতি মেনে সঠিকভাবে অবচয় হিসাবভুক্ত করাই একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা তুলে ধরার জন্য অপরিহার্য।
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন